ভারতের পণ্যে ৫০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নরেন্দ্র মোদি ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নরেন্দ্র মোদি ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেন থামানোর ক্ষমতা কারও নেই—এমনই বার্তা দিচ্ছে তাঁর সাম্প্রতিক একের পর এক সিদ্ধান্ত। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে প্রাসাদ থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেন তিনি।

এ প্রস্তাবিত আইনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’। ধারণা করা হচ্ছে, বিলটি পাস হলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, যাতে তারা রাশিয়া থেকে সস্তা তেল কেনা বন্ধ করে। যদিও বিলটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এখনো কংগ্রেসে চূড়ান্ত ভোটাভুটি হয়নি।

এর আগে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যে ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক ও পাল্টা শুল্কসহ মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। তাতেই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এবার ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে ভারতের রপ্তানির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা চলছে। তবে আলোচনার কোনো অগ্রগতি নেই বলে দাবি করেছেন মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক। তাঁর মতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন না করায় বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, বিশ্বজুড়ে তাঁর আগ্রাসী নীতির লাগাম টানার মতো একমাত্র বিষয় হলো তাঁর নিজের নৈতিকতা। তিনি বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই। আমি মানুষের ক্ষতি করতে চাই না।’

আন্তর্জাতিক আইন মানা উচিত কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মানি; কিন্তু সিদ্ধান্ত আমিই নেব। আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা কী হবে, সেটা নির্ভর করবে ব্যাখ্যার ওপর।’

ভারতের অবস্থান

এর আগেও ট্রাম্প অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিলে ভারত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ভারতের অভিযোগ, পশ্চিমা দেশগুলো দ্বিচারিতা করছে, কারণ তারাও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। শুল্ক চাপের পর ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কিছুটা কমালেও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বার্ষিক রপ্তানি প্রায় ৮৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

রয়টার্স জানায়, জানুয়ারি মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের তুলনায় ডিসেম্বরে ভারতের তেল আমদানি ৪০ শতাংশ কমেছে।

বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক ভারত ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছিল। কম দামে তেল কিনে লাভবান হলেও এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখাই ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছেড়ে দেওয়া ভারতের পক্ষে সহজ নয়, কারণ মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমলেও চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে চীনে ভারতের রপ্তানি ৯০ শতাংশ বেড়ে ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

কৌশল হিসেবে শুল্ক

অনন্ত সেন্টার থিঙ্কট্যাংকের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচী মনে করেন, ৫০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি মূলত রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরির কৌশল। তাঁর মতে, এই বিল পাস হলেও প্রেসিডেন্টের ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অংশীদাররা বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বর্তমানে গুরুতর সংকটে রয়েছে এবং সামনের দিনগুলোতে এই সম্পর্ক আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত