মেঘনা-ভুলুয়ার ভাঙনে বিলীনের পথে রামগতির বয়ারচর

স্টাফ রিপোর্টার
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে ক্রমেই বিক্ষত হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বয়ারচর। নদীভাঙনে একের পর এক ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে বদলে যাচ্ছে পুরো জনপদের চিত্র।

নদীপারের মানুষ ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, বয়ারচরকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে নদীতে জোয়ারের পানি বাড়লে মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে যায়।

কোথাও নদীর পাড় ধসে পড়ছে, আবার কোথাও বসতভিটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। গত বছরও বয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনে বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা বিলীন হয়।

স্থানীয়রা জানান, বয়ারচরের দক্ষিণে ভুলুয়া নদী এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী। দুই নদীর মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এ জনপদের মানুষের কাছে নদীভাঙন যেন নিত্যদিনের আতঙ্ক। নদী দুটির গতিপথ ও প্রবল স্রোতের কারণে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে। ফলে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়ন এবং নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মেঘনা ও ভুলুয়া নদীবেষ্টিত একটি চর হলো বয়ারচর। মেঘনার বুকে পলি জমে জেগে ওঠা এ চরে একসময় ছিল বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ জনপদ। সময়ের সঙ্গে সেখানে মানুষের বসতি, কৃষিকাজ, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

কিন্তু যে নদী থেকে এ চরের সৃষ্টি, সেই মেঘনা এবং পাশের ভুলুয়া নদীই এখন বয়ারচরের মানুষের বড় আতঙ্ক। পলি জমে যে ভূমির জন্ম হয়েছিল, নদীভাঙনে সেই ভূমিই আবার হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, বয়ারচরের ইতিহাস একদিকে নতুন ভূমি সৃষ্টির, অন্যদিকে সেই ভূমি রক্ষার নিরন্তর সংগ্রামের। বর্তমানে এ চরে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস।

২০০২ সালে সিডিএসপি-২ প্রকল্পের আওতায় বয়ারচরের উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়। ২০০৫ সাল থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম আরও জোরালো হয়। মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর মাঝখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠা বয়ারচরে বর্তমানে নদীভাঙনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাজার, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থাও হুমকির মুখে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভুলুয়া নদীর ভাঙনে বয়ারচর সেতুর দুই পাশের মাটি সরে গিয়ে সড়কে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। এতে রামগতি-নোয়াখালী সড়ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন স্থানীয়রা নদী খনন, জিও ব্যাগ ফেলা এবং বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

এদিকে মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর জোয়ারের চাপে বয়ারচরের তেগাছিয়া বাজার এলাকাতেও ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে নদীভাঙনে একটি পুলিশ ফাঁড়ি নদীতে বিলীন হয়। তেগাছিয়া বাজারের বেশ কয়েকটি দোকানও নদীগর্ভে চলে যায়। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এ বাজারটিও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

চলতি বর্ষা মৌসুমেও বয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর নদীভাঙনে মানুষ ঘরবাড়ি হারালেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন সময়ে সাময়িক ব্যবস্থা নিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ভাঙন ঠেকাতে পারছে না।

স্থানীয়রা জানান, চলতি বর্ষায় সেতু ঘাট থেকে চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধের একাধিক অংশ ভেঙে গেছে। স্লুইসগেট এলাকার বাঁধ ভেঙে তিন শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।

নদীভাঙনের কারণে একদিকে মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছেন, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ভেঙে পড়ছে যোগাযোগব্যবস্থাও। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পণ্য পরিবহনসহ দৈনন্দিন জীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ওয়ারেছ মাঝি বলেন, বয়ারচরে প্রতিদিন জোয়ারের তীব্র স্রোতে পানি প্রবেশ করে। রাস্তাঘাট, স্কুল ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে নদী পুরো চরটিকে গিলে ফেলছে। চরবাসীর দাবি, বয়ারচর রক্ষায় দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হোক।

চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. দিদার উদ্দীন বলেন, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা না হলে আগামী বর্ষার আগেই রামগতি উপজেলার মানচিত্র থেকে লক্ষাধিক মানুষের বসবাসের এ চর বিলীন হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি চরের বাসিন্দারা ‘নদীভাঙন ঠেকাও, বয়ারচর বাঁচাও’ দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, বয়ারচরে মেঘনার ভাঙন নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে ভাঙন চলছে। ভাঙন রোধে বিভিন্ন সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ীভাবে কাজ করেছে।

তিনি জানান, স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ‘সবুজ পাতা প্রকল্পে’ রামগতির বয়ারচরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নদীতীরে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণের কাজ করা হবে। প্রকল্পটির অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা যাবে।

সম্পর্কিত