বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও দেশে আতঙ্কজনক কেনাকাটার কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সরবরাহ সংকট নয়, বরং নতুন সরকারের জন্য বড় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছর (২০২৪–২৫) দেশে অকটেনের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার টন, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ টন। তবে ১ থেকে ৪ মার্চের হিসাব অনুযায়ী এই চাহিদা বেড়ে ২ হাজার টনের বেশি হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি কিনে মজুত করছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, অতিরিক্ত এই চাহিদার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং এভাবে চলতে থাকলে দেশের সংরক্ষিত মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপিসি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সরবরাহ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেলের জন্য দিনে ২ লিটার এবং প্রাইভেট কারের জন্য ১০ লিটার তেল সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে মজুত রক্ষা করা সম্ভব হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশে পেট্রল ও অকটেনের একটি বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, অকটেনের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং পেট্রলের শতভাগ দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়। এসব জ্বালানি মূলত গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট শোধন করে তৈরি করা হয়। বর্তমানে চারটি বেসরকারি শোধনাগার ও সরকারি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এই প্রক্রিয়ায় পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কনডেনসেট আমদানি ব্যাহত হলে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২৩ হাজার ৫৫ টন অকটেন মজুত রয়েছে। দৈনিক গড়ে ৯১৩ টন সরবরাহের হিসাবে এই মজুত দিয়ে মাত্র ২৫ দিন চলা সম্ভব। সরকার চলতি মাসে আরও ৫০ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার আশা করছে।
ডিজেলের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১২ হাজার টন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা বর্তমান চাহিদার ভিত্তিতে প্রায় ১৮ দিন চলতে পারে। যদিও ১৩ মার্চের মধ্যে আরও প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে এসব জাহাজ সময়মতো পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকটও তীব্র হয়েছে। পেট্রোবাংলা দৈনিক প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানার উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ডলার সংকট এবং ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে জটিলতার কারণে অনেক কোম্পানি এলপিজি আমদানিতে সমস্যায় পড়ছে। ফলে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪১ টাকার ১২ কেজি সিলিন্ডার বাজারে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন সঞ্চয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সরকার ১১ দফা সাশ্রয়ী নির্দেশনা জারি করেছে।
এই নির্দেশনায় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির ওপরে রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার সীমিত করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি, আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
তাদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।