জবির সংঘর্ষ ছড়াল হাসপাতালে, আহত অর্ধশতাধিক

স্টাফ রিপোর্টার
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের জের রাজধানীর ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে কয়েক দফা উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

শিক্ষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের নেতাদের দাবি, এ ঘটনায় অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। তবে ছাত্রদলের কতজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে তা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।

ক্যাম্পাসে আহত শিক্ষার্থীদের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে আবারও কয়েক দফা সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে। এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের বিভিন্ন প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে হাসপাতালের কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। সংঘর্ষের ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

গুরুতর আহত কয়েকজনকে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেনি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বেলা আড়াইটার দিকে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে একদল শিক্ষার্থী জামায়াত-শিবিরবিরোধী স্লোগান দিয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও অন্য শিক্ষার্থীরাও পাল্টা অবস্থান নেন।

একপর্যায়ে উভয় পক্ষ পরস্পরকে উদ্দেশ করে স্লোগান দিতে থাকে। পরে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে পাশের আদালত এলাকাতেও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় কিছু সময়ের জন্য ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকটি প্রবেশপথে চলাচল সীমিত করা হয়। সংঘর্ষের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে দেখা যায়।

আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে হাসপাতালে যান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, গত দেড় থেকে দুই বছর ধরে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সহাবস্থান ছিল। মঙ্গলবারের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি বলেন, ঘটনার কারণ এবং কারা উসকানি দিয়েছে, তা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। হাসপাতালে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবারও হামলার ঘটনা ঘটে এবং শিক্ষার্থীরা হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নেন।

অধ্যাপক বেলাল হোসেনের ধারণা, ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। অনেকের মাথায় আঘাত লেগেছে। একজন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর মাথায় সেলাই দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি তুলে ধরতে শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলের নেতৃত্বে প্রথমে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয় এবং তাদের প্ল্যাকার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে ক্যাম্পাসজুড়ে দফায় দফায় হামলা চালানো হয়। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ গুরুতর আহত হয়েছেন। চিকিৎসাকেন্দ্রেও তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

মাসুদ রানা আরও দাবি করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য আব্দুল্লাহ ফারুকের পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সহসাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামসহ অনেক শিক্ষার্থীও আহত হয়েছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের সহসভাপতি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন, অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, হামলায় ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনের অবস্থা গুরুতর।

এ ঘটনায় মহানগর দায়রা জজ আদালতের এক সহকারী সরকারি কৌঁসুলিকেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। তিনি জানান, ভাগ্নির ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযুক্ত করে কয়েকজন অতর্কিত হামলা চালান।

সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের সহসভাপতি রিয়াজুল ইসলামকে কয়েকজন ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে গিয়ে রিকশায় তুলে দিতে দেখা যায়। পরে একইভাবে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফকেও ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়।

হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার বিষয়ে জানতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সংঘর্ষের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠন গত ছয় মাসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদল ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনে হল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।

তিনি অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে এবং প্রশাসনকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করছে।

শামসুল আরেফিন আরও দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু একটি গোষ্ঠী নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা ও বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টি করে দেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতের চূড়ান্ত সংখ্যা কিংবা ঘটনার তদন্ত নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

সম্পর্কিত