জুলাই-আগস্ট ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও এবার পদ্মা-মেঘনায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। নদীতে মাছ কম থাকায় অনেক জেলের জ্বালানি খরচও উঠছে না। ফলে কেউ কেউ ইলিশ ধরতে নদীতে নামা বন্ধ করে দিয়েছেন।
ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাঁদপুরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও আড়তগুলোতেও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে জেলে, আড়তদার, শ্রমিকসহ মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শত শত মানুষ বিপাকে পড়েছেন।
চাঁদপুরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাটের আড়ত ঘুরে জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্যান্য বছর এ সময়ে চাঁদপুরের আড়তগুলোতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মণ ইলিশ বিক্রি হলেও বর্তমানে সারাদিনে দুই থেকে তিন মণের বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। হরিণা ফেরিঘাটেও ছোট-বড় মিলিয়ে দিনে প্রায় দুই থেকে আড়াই মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।
জেলেরা জানান, নদীতে কয়েক ঘণ্টা মাছ ধরেও যে পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তা বিক্রি করে নৌকার জ্বালানি খরচ মেটানো যাচ্ছে না। এতে লোকসানের আশঙ্কায় অনেকেই নদীতে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সদর উপজেলার আনন্দ বাজার এলাকার জেলে ইসমাইল দেওয়ান বলেন, নদীতে নেমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল ভোর ৬টায় পদ্মা-মেঘনায় নেমে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাছ ধরে মাত্র ছয়-সাতটি ইলিশ পেয়েছেন। জ্বালানি খরচ বাদ দেওয়ার পর নৌকায় থাকা সাতজনের প্রত্যেকে প্রায় ১০০ টাকা করে পেয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া গ্রামের জেলে হান্নান গাজী বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি ইলিশ ধরতে নদীতে যাচ্ছেন না। একদিন নদীতে গিয়ে ইলিশ বিক্রি করে ৪০০ টাকা এবং আরেক দিন ১ হাজার ২০০ টাকা পেয়েছেন। কিন্তু জ্বালানি খরচই ওঠেনি। তাই অনেকে ইলিশ ধরা বাদ দিয়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বেকার হয়ে পড়েছেন।
ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে দামেও। হরিণা ফেরিঘাটের মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জানান, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকা কেজি দরে। আর ছয় থেকে সাতটি ইলিশে এক কেজি হলে দাম পড়ছে ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকা।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, গত তিন বছর ধরে ইলিশের আমদানি কমছে। আগে এ সময়ে প্রতিদিন আড়তগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ মণ ইলিশ বিক্রি হলেও এখন সারাদিনে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন মণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকেও আগের মতো ইলিশ আসছে না। এতে জেলে ছাড়াও আড়তদার ও শ্রমিকসহ মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকে সমস্যায় পড়েছেন। কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করছেন।
তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো ইলিশের মৌসুম শেষ হয়নি। সাগর থেকে নদীতে ইলিশের বিচরণ যেকোনো সময় বাড়তে পারে। চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক জানান, মূলত বর্ষা মৌসুমে ইলিশের আমদানি বাড়ে। এ বছর আমদানি কিছুটা কম হলেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। আগামী মাস থেকে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের বিচরণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অক্টোবর মাসে নদীগুলোতে ইলিশের বিচরণ আরও বাড়তে পারে। তবে মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে।