কার্যকর মধ্যস্থতা ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের আদালতে বিচারাধীন প্রায় ৪৫ লাখ মামলার জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে জনগণের জন্য দ্রুত, সাশ্রয়ী ও মানবিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্যস্থতা এবং দেওয়ানি মামলা পরিচালনা পদ্ধতির উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আইন পেশাজীবীদের জন্য মৌলিক মধ্যস্থতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, মধ্যস্থতা একটি কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি। এর মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তি কমিয়ে তুলনামূলক দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। দরিদ্র, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আদালতের ওপর মামলার চাপ কমাতে এবং মানুষের বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর জন্য শুধু আইনগত জ্ঞান যথেষ্ট নয়। বিরোধে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে মানবিকতা, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও কার্যকর যোগাযোগের সক্ষমতা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া আইন পেশাজীবীদের জাপানের ‘জাস্টিস উইথ আ স্মাইল’ গ্রন্থটি পড়ার আহ্বান জানান। তার মতে, এ ধরনের সাহিত্য মধ্যস্থতাকারীদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিরোধ নিষ্পত্তির দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
আইনমন্ত্রী বলেন, অনেকের ধারণা আইনজীবীরা সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে অনাগ্রহী। তবে বাস্তবে দেশে ও বিদেশে অসংখ্য সফল মধ্যস্থতা এবং সালিশ কার্যক্রমের পেছনে আইনজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আলোচনাভিত্তিক বিরোধ নিষ্পত্তির ইতিবাচক সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীরা মানসিক চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যারও মুখোমুখি হন। তাই হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর আমলযোগ্য অপরাধ ছাড়া অধিকাংশ বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, প্রকল্পের আওতায় সর্বোত্তম কর্মদক্ষতা প্রদর্শনকারী একজন নারী ও একজন পুরুষ মধ্যস্থতাকারীকে জাপানে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দেশের মধ্যস্থতাকারীরা আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে উঠবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জাপান সরকার, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও আইনজীবী মিস মাসাকো মিয়াতাকেসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা থেকে জাপানের নারিতা রুটে সরাসরি বিমান চলাচলের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেমউল কায়েস।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার বাংলাদেশ প্রধান প্রতিনিধি মিস জুনকো তাকাহাশি, জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের উপমহাপরিচালক কাজুনোরি নোসে এবং বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন।
দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা এবং জেলা জজ আদালতে কর্মরত আইনজীবীসহ ৪০ জন অংশগ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণে মধ্যস্থতার মৌলিক ধারণা, কার্যকর যোগাযোগ, সমঝোতা পরিচালনা, ব্যবহারিক অনুশীলন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রকল্পটির লক্ষ্য দেশে মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচারপ্রার্থীদের জন্য সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।