দ্বিতীয় বিয়েতে কি স্ত্রীর অনুমতি লাগে? হাইকোর্টের রায় নিয়ে বিভ্রান্তির ব্যাখ্যা

স্টাফ রিপোর্টার
 ছবি: হাইকোর্ট
ছবি: হাইকোর্ট

হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি’—এমন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আসলে বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের ক্ষেত্রে কার অনুমতি প্রয়োজন, হাইকোর্ট কী রায় দিয়েছেন এবং আইনেই বা কী বলা আছে—তা পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি।

রিট আবেদনের মূল বিষয় কী ছিল

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বহুবিবাহের বিধান ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তাঁর বর্তমান বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় আরবিট্রেশন কাউন্সিলের (সালিস পরিষদ) লিখিত অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। একই সঙ্গে এই অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে নিবন্ধনযোগ্যও নয়।

এই ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। রিটে বলা হয়, বহুবিবাহের অনুমতির ক্ষেত্রে স্ত্রীদের ন্যায়বিচার, সম-অধিকার ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করার স্পষ্ট নীতিমালা নেই। সালিস পরিষদের কাছে এসব বিষয় যাচাইয়ের পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কী রুল হয়েছিল

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়—স্ত্রীদের সম-অধিকার নিশ্চিত না করেই বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং বহুবিবাহ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় কী বলেছে

চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয়। এই ধারা নারী বা পুরুষ—কোনো পক্ষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে না।

রায়ে আরও বলা হয়, সালিস পরিষদ কাউকে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না এবং অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। ফলে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন সংবিধানপরিপন্থী নয়।

তাহলে দ্বিতীয় বিয়েতে কার অনুমতি লাগবে

আইনের ৬ (১) ধারা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য স্ত্রীর সরাসরি অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়, তবে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি অবশ্যই নিতে হবে

৬ (২) ধারায় বলা হয়েছে, অনুমতির আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না—তা উল্লেখ করতে হবে।
৬ (৩) ধারায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান ও উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সালিস পরিষদ প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত মনে করলে অনুমতি দিতে পারেন।

অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে কী শাস্তি

আইনের ৬ (৫) ধারা অনুযায়ী, সালিস পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে—

  • বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থ তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হবে
  • সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে

রায়ের পর আইনজীবীর ব্যাখ্যা

রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “অনেক দিন ধরেই ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছিল যে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক। বাস্তবে আইনে শুরু থেকেই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধান ছিল। হাইকোর্ট নতুন কিছু বলেননি—আইনের বিদ্যমান অবস্থানই বহাল রেখেছেন।”

তিনি আরও জানান, হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে।

সম্পর্কিত