লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলো দ্রুতই ‘একবিংশ শতাব্দীর তেল’ হয়ে উঠছে। তবে এসব খনিজ আহরণের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বিশ্বের অনেক অরক্ষিত অঞ্চলে দারিদ্র্য ও জনস্বাস্থ্য সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে United Nations University Institute for Water, Environment and Health-এর এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাটারি ও মাইক্রোচিপ তৈরিতে ব্যবহৃত এসব খনিজের চাহিদা বাড়ার ফলে পানির ওপর চাপ বাড়ছে, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী ধাতুর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ২০২৪ সালেই ২ লাখ ৪০ হাজার টন লিথিয়াম উত্তোলনে প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এই খনিজ থেকে যে অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হচ্ছে, তার খুব সামান্যই ক্ষতিগ্রস্ত জনপদগুলোর কাছে পৌঁছাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ বিজয়ী কাভেহ মাদানি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলো দ্রুত তেলের মতো কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। তবে এই তথাকথিত ‘সবুজ রূপান্তর’ বাস্তবে বিশ্বের অন্যত্র মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
International Energy Agency-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব খনিজের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে লিথিয়ামের চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিরল মৃত্তিকা খনিজ উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ইলেকট্রিক গাড়ি উন্নত দেশগুলোতে কার্বন নিঃসরণ কমালেও এর পরিবেশগত মূল্য দিতে হচ্ছে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার খনি অঞ্চলের মানুষদের। ২০২৪ সালে বৈশ্বিকভাবে বিরল খনিজ উৎপাদন থেকে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন টন বর্জ্য তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোবাল্ট উৎপাদনকারী ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো-এর লুয়ালাবা অঞ্চলে পানিদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানে ৬৪ শতাংশ মানুষের মৌলিক পানির সুবিধা নেই। খনি এলাকার কাছাকাছি বসবাসকারীদের মধ্যে ৭২ শতাংশ চর্মরোগ এবং ৫৬ শতাংশ নারী প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক আব্রাহাম নুনবোগু জানান, অনেক মানুষ পানির জন্য দীর্ঘ পথ হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ আবার শহরমুখী হয়ে আরও দারিদ্র্যের মুখে পড়ছেন।
লাতিন আমেরিকার লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল—আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও চিলি—বিশ্বের বৃহত্তম লিথিয়াম মজুতের অন্যতম। তবে এসব অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চিলির আতাকামা অঞ্চলে খনিশিল্পে প্রায় ৬৫ শতাংশ পানি ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে হ্রদগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে।
গবেষক হোসে আইলউইন বলেন, এসব খনি প্রকল্প আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করছে। কৃষি ও পশুপালনভিত্তিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে।
জাতিসংঘের গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে লিথিয়াম উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। এতে পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তারা সুপারিশ করেছেন, খনিজ উত্তোলনে বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক মানদণ্ড, পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই ‘সবুজ রূপান্তর’ জীবাশ্ম জ্বালানির পুরোনো বৈষম্যমূলক ধারাকেই পুনরাবৃত্তি করবে।