বাম্পার ফলন হলেও লক্ষ্মীপুরে সরকারিভাবে বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন। অথচ চলতি মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন ধান। উৎপাদনের তুলনায় সংগ্রহের এই সীমিত লক্ষ্যমাত্রা এবং সরকারি গুদামে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের অভিযোগে লাভবান হতে পারছেন না প্রকৃত কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ সীমিত হওয়ায় এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় হাজার হাজার টন ধান এখনও তাদের ঘরে মজুত রয়েছে। ধান বিক্রি করতে না পারায় তারা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এতে আসন্ন আমন মৌসুমের চাষাবাদ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের পাঁচ উপজেলায় এবার ৩৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। সেখান থেকে উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন ধান। কিন্তু সরকারিভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন, যা মোট উৎপাদনের খুবই সামান্য অংশ।
জেলায় প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কৃষক রয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সদর উপজেলাতেই কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির জন্য কৃষি বিভাগ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কৃষকের তালিকা দেওয়া হলেও সদর উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন। নিয়ম অনুযায়ী একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন ধান বিক্রি করতে পারায় মাত্র ৫১০ জন কৃষকের কাছ থেকেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব।
ইতোমধ্যে সদর খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪২০ জন কৃষকের কাছ থেকে ১ হাজার ২৩১ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করেছে। তবে অধিকাংশ কৃষক এখনও সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাননি। অন্যদিকে বাজারে ধানের দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কম হওয়ায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার দক্ষিণ টুমচর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাশেম, মো. নিজাম, মো. নুরনবী, ফয়েজ আহমেদ ও দেলোয়ার হোসেন জানান, তাদের গ্রামেই অন্তত ২০০ কৃষকের ঘরে এখনও ধানের বস্তা স্তূপ করে রাখা রয়েছে। এক মণ ধান উৎপাদনে যেখানে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা ব্যয় হয়েছে, সেখানে বাজারে ক্রেতারা মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দাম দিচ্ছেন। এতে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না।
তাদের অভিযোগ, কৃষি কার্ড না থাকা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে ঘরে মজুত থাকায় ধানে পচন ধরছে, ইঁদুরে ক্ষতি করছে। পাশাপাশি ঋণ, সার ও কীটনাশকের বকেয়া এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান ইমাম বলেন, সদর উপজেলায় প্রায় এক লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে। তাদের মধ্য থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনের তালিকা খাদ্য গুদামে পাঠানো হয়েছে।
সদর উপজেলা খাদ্য গুদাম পরিদর্শক শহীন মিয়া বলেন, কৃষি বিভাগের তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান কেনা হচ্ছে না। তবে কৃষকের সংখ্যা বিবেচনায় সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা ধান ক্রয় কমিটির সভাপতি ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা জানান, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টনের মধ্যে ১ হাজার ২৩১ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। নির্ধারিত কৃষক ও কার্ডধারীদের কাছ থেকেই ধান কেনা হচ্ছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি কৃষি কার্ডধারীর সংখ্যা এবং সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা বা মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সদর ১ হাজার ৫৩০, রায়পুর ১ হাজার ৩১, রামগঞ্জ ৯৩১, রামগতি ৩১৭ এবং কমলনগর ১৫০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।