ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনেই জমে উঠেছে রাজনৈতিক লড়াই। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এমন নির্বাচনী উত্তেজনা দেখেনি এই অঞ্চলের ভোটাররা। গত ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরদিন ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় নির্বাচনী প্রচারণা। এই প্রচারণা শেষ হয়েছে আজ সকাল ৭টায়। এই ১৯ দিনে জেলার ৪টি আসনে ২৯জন প্রার্থী তাদের প্রচারণা চালিয়েছেন। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের ২ জন প্রার্থী বিএনপি সমর্থন করে মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন। প্রচারণার এই ১৯ দিন কেমন ছিলো লক্ষ্মীপুর?
লক্ষ্মীপুর-১ আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে। বিএনপি ও ১২ দলীয় জোটের প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিমকে মনোনয়ন দেয়ার পর প্রচারণা শুরু হয় ধানের শীষ প্রতীকে। এই পদক্ষেপে বিএনপি আসলেই লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেন এবং প্রার্থী সেলিম নিজ দলের নেতাদের সঙ্গে মাঠে নামেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি পক্ষ থেকে ১৫ জানুয়ারি এই আসনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়। লক্ষ্মীপুর-১ আসনে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তার ভাই মাহবুব আলমকে দেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামের সাথে শরিক হওয়ায় লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন এনসিপি-কে ছেড়ে দেয় জামায়াত। এই নিয়ে জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে জামায়াতের মনোনীত পুর্বের প্রার্থী নাজমুল হাসান পাটোয়ারী এনসিপির পক্ষে মাঠে নামেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরবর্তীতে ২০ জানুয়ারি নাজমুল হাসান পাটোয়ারী তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। মাহবুব আলম জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক। তবে তার বাবা আজিজুর রহমান একই আসনের বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী প্রচারণার সময় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। ১৮ জানুয়ারি নির্বাচনের অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির পক্ষ থেকে রায়পুর সিভিল জজ আদালতের বিচারক বিল্লাল হোসেন লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের বিএনপি প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেন।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনে নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। অতীতে এই আসনে বিএনপির ব্যাপক ব্যবধানে বিজয়ের রেকর্ড থাকলেও এবারের নির্বাচনে জামায়াত শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক ও নিরপেক্ষ ভোটারদের টানার চেষ্টা করছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে দুই প্রার্থীই নারী ভোটারদের টার্গেট করে আলাদা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
তবে প্রচারণার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও বেড়েছে। নির্বাচনী মাঠে একাধিকবার জামায়াত ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও নারী কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সড়ক দুর্ঘটনাকেও রাজনৈতিক হামলা হিসেবে দাবি করে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরই মধ্যে লক্ষ্মীপুর-২ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও ছিল। ঘটেছিলো অস্র উদ্ধারের ঘটনাও।
লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রচারণা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা। প্রচারণার শুরুর দিন থেকেই লক্ষ্মীপুরে জামায়াত ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে একাধিকবার হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
এর মধ্যেই গত ৩ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরে ভোটের অবৈধ ৬টি সিল উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দায়ী করে সংবাদ সম্মেলন করে। পরে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাসহ দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। একাধিকবার জরিমানাও করা হয়েছে।
সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের সত্যতা পাওয়ায় লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী মো. রেজাউল করিমকে সতর্ক করে নির্বাচন কমিশন। পুনরায় আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে তার প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে বলেও জানানো হয়।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই উপকূলীয় আসন লক্ষ্মীপুর-৪ এ মেঘনা নদীঘেঁষা চরাঞ্চল, নদীভাঙন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ইস্যুকে সামনে রেখে এবারও এই আসন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-৪ আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে ‘হেভিওয়েট’ হিসেবে পরিচিত। এবারের নির্বাচনেও মাঠে হেভিওয়েট প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির প্রার্থী এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, জামায়াতের এ আর হাফিজ উল্লাহ, ইসলামী আন্দোলনের খালেদ সাইফুল্লাহ এবং জেএসডির প্রার্থী তানিয়া রব নিয়মিত প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। রাজনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের রেদোয়ান উল্লাহ এবং স্বতন্ত্র কাপ-পিরিচ প্রতীকের প্রার্থী শরাফ উদ্দিন আজাদ নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন, যা নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি। দলটির পক্ষ থেকে রামগতির দক্ষিণাঞ্চলের মেঘনা উপকূলীয় চর এলাকায় নির্বাচনকালীন স্থায়ী সেনাক্যাম্প স্থাপন এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে।
এরই মধ্যে গত ৭ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ আর হাফিজ উল্লাহ ১৭ দফার ৬২ পয়েন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন।
তফসিল অনুযায়ী আজ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলেছে নির্বাচনী প্রচারণা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনের ভোটাররা।
উত্তেজনা ও অভিযোগের মধ্যেও এ অঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী আগ্রহের ঘাটতি নেই। বরং এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন। পাশাপাশি গণভোট নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে লক্ষ্মীপুরের ভোটারদের মধ্যে।
প্রশাসনের সার্বিক তৎপরতা নির্বাচনী এলাকায় প্রশংসনীয় বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহল। এখন পর্যন্ত কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা বড় ধরনের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতির ফলে পুরো এলাকায় শান্তিপূর্ণ ও আনন্দপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়েছে।