আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর জেলার চারটি আসনেই বিএনপির প্রাধান্য থাকবে। বিগত চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল, বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম, নানা সমীকরণ ও জনমত জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে তাদের প্রার্থী এবং একটিতে এনসিপির প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও লক্ষ্মীপুর-২ আসনে মাস্টার রুহুল আমিন ভূঞা এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ড. মো. রেজাউল করিম ভোটের মাঠে তুলনামূলকভাবে বেশ সক্রিয় রয়েছেন।
বিগত চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এ জেলার চারটি আসনেই বিএনপি বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন
চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী জিয়াউল হক ২৪,৭২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। জামায়াত প্রার্থী আল্লামা লুৎফর রহমান ১১,২৪৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়, জাসদ (রব) প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম ৯,৭৮৩ ভোট পেয়ে তৃতীয়, জাপা প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম ৭,৭২৫ ভোট পেয়ে চতুর্থ এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী উকিল সুলতান আহম্মেদ ৬,৪০৬ ভোট পেয়ে পঞ্চম হন।
১৯৯৬ সালে বিএনপির জিয়াউল হক জিয়া ২৮,৫৭৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী শফিকুল ইসলাম ১৭,২৪৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়, জাতীয় পার্টি প্রার্থী মনির আহমেদ ৯,৩৪৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় এবং জামায়াত প্রার্থী আল্লামা লুৎফর রহমান ৮,৮৪৩ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন।
২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আহমেদ ৬৮,৯৯০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. শাহজাহান ৩২,৪৩৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মাহমুদ ২,৫৭২ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন।
২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আহমেদ ৭৪,২৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. শাহজাহান ৫৪,৯৪৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। এ আসনে বরাবরই বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়ে আসছেন।
২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচনে মো. শাহাদাত হোসেন বিএনপির প্রার্থী, মো. মাহবুব আলম এনসিপির প্রার্থী এবং মো. জাকির হোসেন পাটওয়ারী ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার আগে বিএনপির মধ্যে গ্রুপিং ও কোন্দল থাকলেও পরে তা মীমাংসা হয়ে যায়। শাপলা কলির প্রার্থী মাহবুব আলমকে নিয়ে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। হাতপাখার প্রার্থী মো. জাকির হোসেন পাটওয়ারী নিজস্ব দলীয় ভোটের বাইরে উল্লেখযোগ্য সমর্থন না পাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। এ আসনে বিএনপি নেতা ইমাম হোসেন, জহিরুল ইসলামসহ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা একসঙ্গে শাহাদাত হোসেনের পক্ষে কাজ করলে বড় ব্যবধানে জয় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালে এ আসনের মোট ভোটার ৪,১৮,১৬০ জন।
লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর, সদর আংশিক) আসন
চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ উল্ল্যাহ ৩৮,৫৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী খালেদ মোহাম্মদ আলী ২৩,৯২৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং জামায়াত প্রার্থী এম. এ. জব্বার ৩,০৯৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন।
১৯৯৬ সালে বিএনপি প্রার্থী বেগম খালেদা জিয়া ৫৯,০৫৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী ২৬,৯৩৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়, জামায়াত প্রার্থী এম. এ. জব্বার ১৯,৬৭৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় এবং জাপা প্রার্থী চৌধুরী খুরশিদ আলম ৬,২৯৪ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন।
২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ১,২৩,৫২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারুনুর রশিদ ৪৪,৯৭৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। এ আসনে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি।
২০০৮ সালে বিএনপি প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঞা ১,২৯,৯৯৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারুনুর রশিদ ৫১,৭৩২ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী খোকন ৩৭,৭১৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। জামায়াত এ আসনে প্রার্থী দেয়নি।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঞা, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা আমির এস. ইউ. এম. রুহুল আমিন ভূঞা এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. হেলাল উদ্দিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই এবং দলীয় কোন্দলও নেই। আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের ভোট আগের চেয়ে বাড়তে পারে। তবে ব্যক্তি ইমেজ, জনমত ও বিগত দিনের ভোটের সমীকরণে বিএনপির প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঞা বড় ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালে এ আসনের মোট ভোটার ৪,৯৩,৯৭০ জন।
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন
লক্ষ্মীপুর-৩ সদর আসন বরাবরই বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির অ্যাডভোকেট খায়রুল এনাম বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এ দুই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় স্থানে ছিল। জামায়াতের কোনো প্রার্থী ছিল না।
২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি মোট প্রাপ্ত ভোটের ৬৮.০২ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. শাহজাহান কামাল ২৯.৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন।
২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ১,০৯,৬৩১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসেম ৮২,০৫০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি, ডাকসুর সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব এবং সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য। তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিত। বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। একাধিক মামলার শিকার হয়ে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেছেন। তিনি একজন পরীক্ষিত ও ক্লিন ইমেজের নেতা।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. মো. রেজাউল করিম কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য। তিনি এলাকাভিত্তিক পরিচিতিতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকলেও সংগঠনের শক্তির ওপর ভর করেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. ইব্রাহিম স্থানীয়ভাবে দলের জেলা সভাপতি হিসেবে পরিচিত। সব মিলিয়ে ব্যক্তি ইমেজ, জনমত ও ভোটের সমীকরণে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ আসনের মোট ভোটার ৪,৪৪,৪৭২ জন।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসন
এ আসনটিও বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিএনপি তিনবার এবং জাসদ (রব) একবার নির্বাচিত হয়েছে। বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলেও বিএনপির প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন।
২০২৬ সালে এ আসনে মোট ভোটার ৪,১৮,১৬০ জন। বিএনপির প্রার্থী দুইবারের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন। জামায়াতের প্রার্থী মো. আশরাফুর রহমান হাফিজ উল্ল্যাহ, জাসদ (রব) প্রার্থী তানিয়া রব এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ। ব্যক্তি ইমেজ ও প্রতীক উভয় ক্ষেত্রেই এবিএম আশরাফ উদ্দিন এগিয়ে রয়েছেন। জনমত ও ভোটের সমীকরণ বিবেচনায় এ আসনেও বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে লক্ষ্মীপুরে বড় পরিসরে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনা না ঘটলেও মববাজি ও মবের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয় নিয়ে জেলা শহরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের মতে, এসব ঘটনায় কারা জড়িত তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের ইমেজ সংকট নেই। দলীয় কোন্দল অনেকটাই মিটে গেছে। ফলে সব সমীকরণে লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনে বিএনপি প্রার্থীরা এগিয়ে থাকবে বলে জনমতে প্রতীয়মান হচ্ছে।