লক্ষ্মীপুর জেলার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে মেঘনার উপকূলীয় জনপদ পর্যন্ত এখন নির্বাচনী হাওয়া। চায়ের কাপে ঝড় উঠছে কে হচ্ছেন আগামী দিনের কাণ্ডারি? লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর এই পাঁচটি জনপদের তরুণ ভোটাররা এবার কেবল প্রার্থীর মুখ দেখে নয়, বরং কাজের হিসাব মিলিয়ে ভোট দিতে চায়। প্রার্থীরা যখন উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তখন সাধারণ তরুণদের মনে প্রশ্ন জাগছে সেই দৃশ্যমান উন্নয়নের আড়ালে আমাদের মানবিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা আর কর্মসংস্থান কোথায়?
১. প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি বনাম কঠিন বাস্তবতা
নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা মাদকমুক্ত সমাজ আর আধুনিক লক্ষ্মীপুরের রঙিন খোয়াব দেখান। জনসভায় দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা দেন, তরুণরাই দেশ গড়ার কারিগর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের মিছিলে যে তরুণরা প্রখর রোদ উপেক্ষা করে স্লোগান দেয়, ভোটের পর তাদের অনেকেরই ঠাঁই হয় তথাকথিত বড় ভাইদের ক্যাডার বাহিনীতে কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানায়।
লক্ষ্মীপুরের পাঁচটি থানাতেই আজ মাদক আর কিশোর গ্যাং বিষবৃক্ষের মতো ডালপালা মেলেছে। আমরা দেখছি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একদল তরুণ কিশোরদের হাতে বইয়ের বদলে তুলে দিচ্ছে দেশীয় অস্ত্র। নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তারে এই কিশোরদের পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রার্থীদের কাছে আমাদের সপাটে প্রশ্নআপনারা কি পারবেন এই ‘পেশিশক্তির রাজনীতি’ বন্ধ করে সুস্থ মেধার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে?
২. মাদক কারবারে যখন ‘অসহায়’ মানুষের ব্যবহার
লক্ষ্মীপুরের মাদক পরিস্থিতি এখন কেবল বড় মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্থানীয় মাদক সম্রাটরা এখন অত্যন্ত কৌশলে সমাজের সবচেয়ে অসহায় অংশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। শহরের ফুটপাতে থাকা পথশিশু এবং দুস্থ নারীদের যৎসামান্য টাকার বিনিময়ে মাদক বহনের কাজে লাগানো হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই এই অমানবিক পথ বেছে নিয়েছে তারা। একজন পথশিশু যখন শিক্ষার পরিবর্তে ইয়াবার প্যাকেট চিনছে, তখন সেই দায়ভার সমাজ ও রাজনীতির ওপরই বর্তায়। প্রার্থীরা মাদকমুক্ত জেলার প্রতিশ্রুতি দিলেও এই শিকড় উপড়ে ফেলার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ আমরা কারো ইশতেহারে দেখছি না। মাদক দমনে কেবল চুনোপুঁটি ধরা নয়, রাঘববোয়ালদের রাজনৈতিক আশ্রয় থেকে বের করে আনা এখন সময়ের দাবি।
৩. সাইবার বুলিং: রাজনীতির নামে ডিজিটাল সন্ত্রাস
বর্তমান সময়ে লক্ষ্মীপুরের তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন এক আতঙ্কের নাম সাইবার বুলিং। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ধারী কিছু শিক্ষার্থী বা তরুণ নামসর্বস্ব ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপ খুলে এই অপকর্ম চালাচ্ছে। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ভিন্ন মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার চরিত্রহনন করা হচ্ছে। এসকল পেইজ থেকে যেভাবে মিথ্যা অপবাদ আর কুরুচিপূর্ণ পোস্ট করা হয়, তাতে অনেক মেধাবী তরুণের সামাজিক জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই হয়রানি আরও ভয়াবহ। রাজনীতির দোহাই দিয়ে এই যে ডিজিটাল সন্ত্রাস, এর লাগাম টানবে কে? আগামী দিনের জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের দাবি, তাদের অনুসারী এই ডিজিটাল সন্ত্রাসীদের যেন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে কোনো বাধা দেওয়া না হয়।
৪. আঞ্চলিক সংকট ও আমাদের দাবি
লক্ষ্মীপুরের পাঁচটি থানার সমস্যাগুলো ভৌগোলিক কারণেই ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু সমাধানের আকুলতা একই:
সদর ও রায়পুর: এখানে শিল্পকারখানার অভাব প্রকট। বেকার তরুণরা হতাশ হয়ে মাদকের দিকে ঝুঁকছে। আমাদের দাবি এখানে বিসিক শিল্পনগরীর কার্যকর সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ জোন তৈরি করতে হবে।
রামগঞ্জ: এখানকার তরুণদের মধ্যে শিক্ষার পরিবর্তে বিদেশের মোহ বেশি। এই প্রবণতা রোধে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে।
কমলনগর ও রামগতি: নদী ভাঙন এই অঞ্চলের প্রধান ক্ষত। ছিন্নমূল মানুষগুলো যখন ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে আশ্রয় নেয়, অভাবের তাড়নায় তারাই অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি কেবল ‘বাঁধ নির্মাণ’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্থায়ী আবাসন ও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা ইশতেহারে আনতে হবে।
৫. তারুণ্যের ইশতেহার: আমাদের ৫টি দাবি
আসন্ন নির্বাচনে আমরা এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চাই, যিনি কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ লক্ষ্মীপুর গড়বেন। আমাদের চাওয়া স্পষ্ট:
১. রাজনৈতিক সংস্কার: কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধ করতে হলে 'রাজনৈতিক বড় ভাই' সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কোনো অপরাধীর পরিচয় যেন 'দলীয় কর্মী' হতে না পারে।
২. কারিগরি ও আইটি হাব: প্রতিটি থানায় সরকারি উদ্যোগে হাই-টেক ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করতে হবে, যাতে তরুণরা প্রযুক্তিনির্ভর আয়ে মনোযোগ দেয়।
৩. নিরাপদ ডিজিটাল স্পেস: সাইবার বুলিং প্রতিরোধে জেলা পুলিশে একটি শক্তিশালী 'সাইবার সেল' এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. মাদকের রুট বন্ধ: পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষদের মাদক ব্যবসার গুটি হওয়া থেকে বাঁচাতে তাদের পুনর্বাসন ও শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।
৫. জবাবদিহিতা: জনপ্রতিনিধিদের প্রতি ৬ মাস অন্তর তরুণদের মুখোমুখি হতে হবে এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। প্রার্থীরা বদলে যায়, কিন্তু লক্ষ্মীপুরের তারুণ্যের হাহাকার যেন শেষ হয় না। আমরা এমন এক জেলা চাই না যেখানে রাতের আঁধারে পথশিশুরা ইয়াবার প্যাকেট বহন করে, বরং আমরা এমন এক জেলা চাই যেখানে প্রতিটি শিশু স্কুলে যাবে এবং প্রতিটি তরুণ হবে আগামীর উদ্যোক্তা। মেঘনার বাতাসে মাদকের গন্ধ নয়, আমরা চাই অগ্রগতির সুবাস। এবারের ভোট হবে আগামীর প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভোট।