লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ফাতেমা আক্তার (২০) হত্যা মামলার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। ২০২০ সালের ১৯ জুলাই নিজ বাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যার তথ্য উঠে আসে। পরে হত্যা মামলা করা হয় এবং প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময়েও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
ফাতেমা আক্তার রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের লুদুয়া গ্রামের ভূঁইয়াবাড়ির মৃত সিরাজুল ইসলামের মেয়ে। ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে একা ছিলেন। পরিবারের দাবি, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে প্রতিবেশীরা তাঁকে হত্যা করেছেন।
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৯ জুলাই ফাতেমার মরদেহ তাঁর নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তখন ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করা হয় এবং রায়পুর থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করেছিল।
পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ফাতেমাকে মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট প্রতিবেদনটি রায়পুর থানায় পাঠানো হয়। এর ভিত্তিতে ২৯ আগস্ট ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে ফাতেমাকে নিজ কক্ষে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়। মামলায় একই বাড়ির রায়হান, রাইমা বেগম, শারমিন আক্তার ও মো. ইয়াসিনকে আসামি করা হয়। পরে পুলিশ মামলার প্রধান আসামি রায়হানকে গ্রেপ্তার করে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন।
এরপর মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন।
ডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাতেমাকে মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলেও আসামিদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, নির্ভরযোগ্য বা পরোক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। অন্য কোনো ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত—এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায়নি। ফলে ভবিষ্যতে মামলায় সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে ওই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারেনি ফাতেমার পরিবার। ২০২২ সালের ৫ মে মামলার বাদী সারাবান তহুরা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেন। শুনানি শেষে আদালত ডিবির তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
এরপর মামলাটি সিআইডির হাতে যায়। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সময়ে মোট আটজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশ ও সিআইডিতে তিনজন এবং সিআইডিতে যাওয়ার পর আরও পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মামলার তদন্তের অগ্রগতিও বারবার নতুন করে শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। কখনো তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে, আবার কখনো নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা পরিবার এখন এসব আশ্বাসে হতাশ হয়ে পড়েছে।
মামলার বাদী ও ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বলেন, বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। এক কর্মকর্তা তদন্ত শেষ পর্যায়ে থাকার কথা বললেও নতুন কর্মকর্তা এসে আবার নতুন করে তদন্ত শুরু করেন। ছয় বছর ধরে তারা শুধু আশ্বাসই শুনছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডির পরিদর্শক ওবায়দুল ইসলাম। তিনি জানান, গত ছয় মাস ধরে তিনি মামলাটি তদন্ত করছেন। বিভিন্ন দিক থেকে সূত্র পাওয়ার চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মামলার ৬ নম্বর সাক্ষী রেহানুজ্জামান রনি ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, ডিবির তদন্তের সময় ঘটনাস্থলে যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি স্পষ্ট হলেও হত্যাকারী শনাক্তের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে ফাতেমার মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর মা হাসনা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মেয়েকে হারানোর শোক নিয়ে ছয় বছর ধরে অপেক্ষা করছেন তিনি। হাসনা বেগম বলেন, বিচার তো দূরের কথা, কে এবং কেন তাঁর মেয়েকে হত্যা করেছে—সেই রহস্যও এখনো বের হয়নি। তবুও মা হিসেবে তিনি আশা করেন, দ্রুত হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হবে, খুনি ধরা পড়বে এবং তাঁর মেয়ের হত্যার বিচার হবে।
অন্যদিকে মামলার প্রধান আসামি মো. রায়হান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ফাতেমা আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক বিরোধের কারণে তাঁদের অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো ও হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।