ঢাকা, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ : রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এফডিআই কমেছে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ওই সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ কমার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সে সময় বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ ছিল না। রাজনৈতিক সমঝোতা কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগও বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, যা বিনিয়োগ কমার অন্যতম কারণ।
একই সময়ে পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা (রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস) কমেছে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এ খাতে এসেছে ২১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস বলতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম থেকে অর্জিত মুনাফা, যা লভ্যাংশ হিসেবে বাইরে না পাঠিয়ে দেশে পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়। তবে প্রকৃত এফডিআই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের ওপর, যা এখনও দুর্বল রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃবিনিয়োগ কমিয়েছে। নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও নীতিগত জটিলতা, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিদেশি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, লজিস্টিক সুবিধার ঘাটতি এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এ খাতে প্রভাব ফেলছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো না গেলে রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নত হলেও বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। বিনিয়োগকারীরা আগে সুযোগ-সুবিধা মূল্যায়ন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ কমেছে। এতে বোঝা যায়, দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীই নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইকুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ—এই তিন উৎস মিলিয়ে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৬ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।