লক্ষ্মীপুরে দিনের আলোতে টানা পাঁচ ঘণ্টা প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনায় চার শিক্ষার্থী নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হলেও সতেরো মাস পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোনো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে এবং নিহতদের পরিবার ও আহতদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছরের ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এ ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চারতলা ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে একদল অস্ত্রধারী পিস্তল, শটগান ও কাটাবন্দুক দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়। মাঝেমধ্যে বাঁশির সংকেত দিয়ে নিচে থাকা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়, যা চলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলি ছুড়তে দেখা যায় একাধিক ব্যক্তিকে। পুলিশের ভাষ্যমতে, অস্ত্রধারীদের অধিকাংশই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মী।
সেদিন সকাল ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুর শহরের মাদাম এলাকায় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। অপরদিকে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করেন ঝুমুর এলাকায়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষ চলার পর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা পিছু হটেন।
এরপর দুপুরের দিকে জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম সালাহ উদ্দিনের বাসার সামনে শত শত আন্দোলনকারী জড়ো হন। অভিযোগ রয়েছে, ওই চারতলা ভবনের ছাদ থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টানা গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে নেওয়ার পর মোট চার শিক্ষার্থী নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হন।
নিহত শিক্ষার্থীরা হলেন—লক্ষ্মীপুর ভিক্টোরিয়া কলেজের সাদ আল আফনান, দালাল বাজার ডিগ্রি কলেজের সাব্বির হোসেন রাসেল, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের কাউছার হোসেন এবং একই কলেজের শিক্ষার্থী ওসমান গণি।
ঘটনার এক বছর পার হলেও কোনো অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নিহতদের স্বজনরা বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। নিহত সাদ আল আফনানের মা নাছিমা আক্তার বলেন,
“আমার ছেলেকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভিডিওতে সবাই দেখেছে কারা অস্ত্র হাতে ছিল। অথচ এতদিনেও একটি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। তাহলে বিচার কীভাবে হবে?”
গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত খালেদ মাহমুদ বলেন, সেদিন হাসপাতালে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।
“সারি সারি গুলিবিদ্ধ মানুষ, আর্তনাদে ভরে গিয়েছিল পুরো হাসপাতাল। যারা প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখিয়ে গুলি চালাল, তাদের অস্ত্র উদ্ধার না হলে তদন্তে মানুষ কীভাবে আস্থা রাখবে?”—প্রশ্ন তাঁর।
রাজনৈতিক মহলেও অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন,
“শত শত মানুষ গ্রেপ্তার করা হলেও একটি অস্ত্রও উদ্ধার না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জনগণ জানতে চায়, সেই অস্ত্রগুলো কোথায় গেল।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা অভিযোগ করেন, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধীরগতির করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ পর্যন্ত প্রায় ১৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন,
“ভিডিওতে যাদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
উল্লেখ্য, ওই সময় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও রামগঞ্জ থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় লুট হওয়া ২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ রাউন্ড গুলিও এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রও এই সহিংস ঘটনার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও অস্ত্র উদ্ধার ও বিচারিক অগ্রগতির দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় লক্ষ্মীপুরের এই ভয়াবহ গুলিবর্ষণ মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিহতদের স্বজনদের উদ্বেগ কাটছে না।