এআইয়ের দাপটে বদলাচ্ছে চাকরি ও শিক্ষা: পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থা কি অচল হয়ে পড়ছে?

 ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বদলে যাচ্ছে শিক্ষা ও চাকরির ধরণ
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বদলে যাচ্ছে শিক্ষা ও চাকরির ধরণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামোকেও বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করেছে, যেখানে মাত্র এক বছর আগেও এই হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। প্রযুক্তির এই বিস্ফোরণ শুধু কাজের ধরন বদলাচ্ছে না, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে নীতিনির্ধারকদের।

শিক্ষকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘আই কুইট টিচিং বিকজ অব চ্যাট জিপিটি’ শীর্ষক নিবন্ধে মার্কিন শিক্ষক ভিক্টোরিয়া লিভিংস্টোন জানান, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত চ্যাটজিপিটির সাহায্যে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করছে। ফলে কোন লেখা মানুষের আর কোনটি এআইয়ের— তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ২০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি কখনও এমন সংকটে পড়েননি বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এখন শিক্ষার্থীদের লেখার চেয়ে এআইয়ের আউটপুটে ফিডব্যাক দিতে বেশি সময় চলে যাচ্ছে। শুধু স্কুল-কলেজ নয়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী এমনকি পিএইচডি গবেষকরাও স্বীকার করছেন— তাঁরা নোট আকারে তথ্য দিয়ে এআইকে দিয়ে পুরো গবেষণা নিবন্ধ লিখিয়ে নিচ্ছেন। এতে চিন্তাশক্তি, যুক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষাবিদরা।

শঙ্কার পাশাপাশি সুযোগ

তবে এআই শুধু হুমকি নয়, বড় সুযোগও তৈরি করছে। বাংলাদেশের তরুণদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট কাজ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে আইসিটি সেবার রপ্তানি ছিল ৭০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি, যা এআইয়ের সুবাদে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এআই যুগে কাজ মানেই শুধু কোড লেখা নয়। এআই প্রশিক্ষণ, ডেটা যাচাই, কনটেন্ট বিশ্লেষণ, ফ্যাক্ট চেকিং, ডেটা লেবেলিং, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, মডেল অপারেশন ও আউটপুট মান নিয়ন্ত্রণ— এসব খাতে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

শিক্ষাব্যবস্থা কি নতুন পথে যাবে?

এআই যখন মুহূর্তেই জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারে, তখন ১৫-২০ বছর ধরে একই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক চাকরির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশেই এআইয়ের প্রভাব পড়বে। ম্যাককিনজি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ যন্ত্রের হাতে চলে যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে— শিখতে পারার ক্ষমতা, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান, জ্ঞান প্রয়োগ এবং নিজেকে মূল্যায়নের দক্ষতা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা ও মূল্যবোধ তৈরি, শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়। স্কুল হবে এমন জায়গা, যেখানে নৈতিকতা, মানবিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, খেলাধুলা, যোগাযোগ দক্ষতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠবে।

উচ্চশিক্ষার নতুন ধারা

উচ্চশিক্ষা থাকবে, তবে তার কাঠামো হবে ভিন্ন। ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা হবে সমস্যাভিত্তিক ও গবেষণাকেন্দ্রিক— যেখানে শিক্ষার্থীরা এমন জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করবে, যার সমাধান এআই দিতে পারে না। বিশ্বব্যাপী ইতোমধ্যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা মডেল চালু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন গভর্নরস ইউনিভার্সিটি ও সাউদার্ন নিউ হ্যাম্পশায়ার ইউনিভার্সিটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এই মডেল অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশ কী করবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে এখনই দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রয়োগভিত্তিক ও দক্ষতা মূল্যায়ন জরুরি। ইউনেসকোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তৈরি এআই দক্ষতার ফ্রেমওয়ার্ক বাংলাদেশ ব্যবহার করতে পারে।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বার্তা— কেবল নীতিনির্ধারকদের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। নিজেকে সময়ের সঙ্গে বদলাতে না পারলে ভবিষ্যতের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।

সম্পর্কিত